রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে যেভাবে বদলে যাচ্ছে পাবনার অর্থনীতি
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে জেলার অর্থনীতি, অবকাঠামো ও জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। একসময় কৃষি ও বস্ত্রশিল্পনির্ভর অঞ্চল হিসেবে পরিচিত পাবনা এখন ধীরে ধীরে আধুনিক শিল্প, ব্যবসা ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে রূপ নিচ্ছে।
রূপপুর প্রকল্পের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় গড়ে উঠেছে আধুনিক হোটেল, রিসোর্ট, শপিং কমপ্লেক্স, আবাসন প্রকল্প ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে এসেছে নতুন গতি।
২০০৯ সালে সরকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। পরে ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান Rosatom-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান এটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের সঙ্গে চুক্তি সই হয়। প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্প দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি লাখো পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধা পাবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েক হাজার বিদেশি নাগরিক, বিশেষ করে রাশিয়ার কর্মীরাও রয়েছেন। তাঁদের আবাসনের জন্য ঈশ্বরদী-কুষ্টিয়া সড়কের নতুনহাট এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক আবাসিক এলাকা ‘গ্রিন সিটি’, যেখানে একাধিক বহুতল ভবন তৈরি করা হয়েছে।
এই আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট, ফুড কোর্ট ও আধুনিক বিপণিবিতান গড়ে উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বলছেন, কয়েক বছর আগেও যেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য সীমিত ছিল, এখন সেখানে প্রতিদিন ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে।
স্থানীয় ফল ব্যবসায়ী রাজন হোসেন জানান, রাজধানী ছেড়ে এখন তিনি ঈশ্বরদীতেই ব্যবসা করছেন এবং আগের তুলনায় বেশি লাভ পাচ্ছেন। অন্যদিকে পোশাক ব্যবসায়ী জিহাদ হোসেন বলেন, বিদেশি কর্মীদের চাহিদার কারণে নতুন ধরনের পোশাকের দোকান গড়ে উঠেছে এবং স্থানীয় ক্রেতার সংখ্যাও বেড়েছে।
রূপপুর প্রকল্পের প্রভাবে পর্যটন ও বিনোদন খাতেও পরিবর্তন এসেছে। পাবনায় তৈরি হয়েছে একাধিক আধুনিক রিসোর্ট, ইকোপার্ক ও বিনোদনকেন্দ্র। এসব স্থানে দেশি পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি নাগরিকদেরও নিয়মিত উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
রিসোর্ট উদ্যোক্তারা জানান, বিদেশি অতিথিদের কথা মাথায় রেখে আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের খাবার, আধুনিক আবাসন ও বিনোদনের ব্যবস্থা থাকায় এসব স্থানে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে।
স্থানীয় উন্নয়নকর্মীরা মনে করছেন, রূপপুর প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি পুরো অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যটন খাত একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ায় পাবনা এখন নতুন সম্ভাবনার জেলার তালিকায় উঠে এসেছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, ভবিষ্যতে রূপপুরকে কেন্দ্র করে পাবনা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ









